বিশ্বের নানা দেশ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়তে এসে কুমিল্লা শহরকে আপন করে নিয়েছেন শত শত বিদেশি শিক্ষার্থী। ক্লাসরুমে, হোস্টেলে, হাসপাতালের ওয়ার্ডে—এখন তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় সাবলীল বাংলা। তারা বাংলায় গান গায়, তৃপ্তি ভরে খায় বাঙালি খাবার।
কুমিল্লার চারটি মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত ৭ শতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থীর কাছে বাংলা ভাষা এখন শুধু প্রয়োজনের বিষয় নয়—এটি ভালোবাসা, আবেগ আর আত্মিক বন্ধনের নাম। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়ও তারা শিখছেন বাংলায়। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে বসবাস করতে করতে ভাষাটি তাদের হৃদয়ে গেঁথে গেছে। এখন বাংলা তাদের কাছে মিষ্টি, আপন আর আপনজনের মতোই প্রিয়।
বাংলা ভাষার পাশাপাশি তারা মুগ্ধ কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী রসমালাই–এর স্বাদে। যেন ভাষা আর মিষ্টির এই মেলবন্ধন কুমিল্লাকে করে তুলেছে ভিনদেশিদের দ্বিতীয় ঠিকানা। তাদের হাত ধরেই বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলা ভাষা, কুমিল্লার ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের সংস্কৃতি।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ, ময়নামতি মেডিকেল কলেজ ও সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ–এ অধ্যয়ন করছেন এসব শিক্ষার্থী। ভারতের মেঘালয়, মণিপুর, কাশ্মীর, অন্ধ্রপ্রদেশ, হরিয়ানা, ঝাড়খন্ড, উড়িষ্যা ও কলকাতাসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যেমন শিক্ষার্থী এসেছেন, তেমনি নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও ফিলিস্তিন থেকেও রয়েছেন অনেকে। অতীতে জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার শিক্ষার্থীরাও এখান থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়ে গেছেন।
বর্তমানে কুমিল্লা জেলার পাঁচটি মেডিকেল কলেজের মধ্যে চারটিতেই বিদেশি শিক্ষার্থী রয়েছেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে ২৫ জন, ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজে ২৮৯ জন, ময়নামতি মেডিকেল কলেজে ২৫০ জন এবং সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজে শতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে প্রস্তুত তারা। আবেগঘন কণ্ঠে গেয়ে উঠবেন—“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।” ভাষার প্রতি এই টান যেন ভিনদেশি হৃদয়েও জাগিয়ে তুলছে এক টুকরো বাংলাদেশ।
নেপালের শিক্ষার্থী ওরিন থাপা, ভারতের অর্জুন, কাশ্মীরের হাজে কাদের ও মণিপুরের উর্বশী জানান, শুরুতে পড়াশোনার প্রয়োজনেই বাংলা শিখতে হয়েছিল। তবে এখন এ ভাষায় কথা বলতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাদের ভাষায়, “কুমিল্লার রসমালাইয়ের মতোই বাংলা ভাষাও বেশ মিষ্টি।
ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার (ফরেন অ্যাফেয়ার্স) আতাউল মাসুদ রাজীব জানান, এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত প্রতিনিয়ত বাংলা ভাষায় কথা বলতে হয় বলেই শিক্ষার্থীরা দ্রুত ভাষাটি রপ্ত করতে পেরেছেন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. সফিকুর রহমান বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনেই বাংলা শিখে। তবে তাদের মুখে বাংলা শুনতে সত্যিই ভালো লাগে। একজন বাঙালি হিসেবে তিনি চান, বিশ্বের বুকে আরও ছড়িয়ে পড়ুক বাংলা ভাষা।
ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর এমডি জাকিরুল ইসলাম জানান, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ভাষা কোর্স চালু রয়েছে। ফলে তারা সহজেই রোগীদের সঙ্গে আন্তরিক ও সাবলীলভাবে বাংলায় কথা বলতে পারছেন।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মির্জ্জা তাইয়েবুল ইসলাম জানান, কুমিল্লা সরকারী ও বেসরকারী মিলিয়ে ৭ শত বিদেশী শিক্ষার্থী চিকিৎসা বিজ্ঞানে লেখাপড়া করছেন। বিদেশী শিক্ষার্থীরা যখন বাংলা ভাষায় কথা বলেন তখন গর্বে বুকটা ভরে উঠে।
বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. সেলিম বলেন, বাংলা ভাষা শেখার মাধ্যমে বিদেশি শিক্ষার্থীরা শুধু পড়াশোনায় নয়, এ দেশের সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গেও গভীর বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন। এতে করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সুনাম। বিশেষ করে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা যখন বাংলা ভাষায় কথা শিখে, তখন বাংলাদেশীরা যখন ভারতে চিকিৎসা নিতে যায়, সেক্ষেত্রে রোগী ও তার স্বজনরা চমৎকার করে বাংলা ভাষায় তাদের সমস্যা তুলে ধরেন। বাংলা ভাষা ভারতীয় চিকিৎসক তখন খুব সহজেই রোগের ধরণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারেন। তবে সবকিছিু ছাপিয়ে
ভাষার এই অনুরাগ যেন প্রমাণ করে—বাংলা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি ভালোবাসার আরেক নাম।





