কাগজে-কলমে তিনি ছিলেন একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। কিন্তু মাঠে, মানুষের পাশে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভরসার এক নাম কখনো উদ্ধারকর্মী, কখনো অভিভাবক, আবার কখনো সংকটের মুহূর্তে শেষ আশ্রয়স্থল। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা থেকে বিদায় নিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুর রহমান, রেখে গেলেন মানবিকতা ও প্রশাসনের এক অনন্য মেলবন্ধনের স্মরণীয় অধ্যায়।
দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাসের দায়িত্বপালন শেষে বিদায়ের প্রাক্কালে নিজের অভিজ্ঞতার যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, তা কেবল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের হিসাব নয় বরং একটি উপজেলার নীরব সংগ্রাম, চ্যালেঞ্জ এবং পরিবর্তনের ধারাবাহিক দলিল।
শীতের কনকনে রাতে রাস্তায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকা এক অসহায় মানুষকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া এটি কোনো নির্ধারিত সরকারি দায়িত্ব নয়। তবুও এমন মানবিক উদ্যোগে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন তিনি। হারিয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধাকে খুঁজে বের করে দাউদকান্দিতে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কিংবা শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ এসব কর্মকাণ্ড তাকে স্থানীয়দের কাছে “প্রশাসক” নয়, বরং “মানুষের কর্মকর্তা” হিসেবে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
বর্ষার এক রাতে গোমতী নদীর বাঁধ রক্ষায় বালুর বস্তা নিয়ে ছুটে যাওয়ার ঘটনাও ছিল ব্যতিক্রমী। যেখানে সাধারণত মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই দায়িত্ব পালন করেন, সেখানে একজন ইউএনও’র সরাসরি অংশগ্রহণ প্রশাসনের প্রচলিত কাঠামোকে ভেঙে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যা একদিকে প্রশংসিত, অন্যদিকে আলোচনারও জন্ম দিয়েছে।
মানবিকতার পাশাপাশি আইনের প্রয়োগেও ছিল তার দৃশ্যমান সক্রিয়তা। দায়িত্বকালে ৩৬৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয় বরং নিয়মিত অভিযান, আইনের প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক তৎপরতার ধারাবাহিকতারই প্রতিফলন।
অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে অভিযান, পরিবেশ ও কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ, স্থানীয় বিরোধ ও পারিবারিক কলহ নিরসনে হস্তক্ষেপ এসব উদ্যোগ মুরাদনগরে প্রশাসনের উপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর করে তুলেছে।
তার কর্মকালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল শিক্ষা খাতে সরাসরি সম্পৃক্ততা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন, মানোন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ, একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা এবং এমনকি রাতের বেলায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খোঁজ নিতে তাদের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হওয়া এসব কার্যক্রম প্রচলিত প্রশাসনিক সীমার বাইরে গিয়ে নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ কতটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেকসই, নাকি ব্যক্তিনির্ভর, সে প্রশ্নও থেকে যায়।
দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় অনুষ্ঠানে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমিয়েছে এবং সামাজিক সম্প্রীতির বার্তাকে শক্তিশালী করেছে।
তবে বিদায়ের আগে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, দাপ্তরিক ও আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই চাইলেও প্রত্যাশিত সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই স্বীকারোক্তি প্রশাসনিক কাঠামোর বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে যেখানে ব্যক্তিগত সদিচ্ছা থাকলেও বিধিবদ্ধ সীমা অতিক্রম করা যায় না।
মো. আবদুর রহমানের এই কর্মকাল মুরাদনগরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে প্রশাসন কি কেবল নীতিমালার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মানবিক হস্তক্ষেপের এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে?
তার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয়দের মনে তৈরি হয়েছে এক ধরনের শূন্যতা। তবে একই সঙ্গে জন্ম নিয়েছে প্রত্যাশা পরবর্তী কর্মকর্তাও কি এই মানবিক ও কার্যকর প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারবেন?
বিদায়বেলায় সবার কাছে নিজের পরবর্তী কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের জন্য দোয়া চেয়ে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বার্তাটি যেন এক দীর্ঘ প্রশাসনিক অধ্যায়ের নীরব পরিসমাপ্তি যেখানে দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও অভিজ্ঞতার সঞ্চিত গল্পগুলো সময়ের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে।
মুরাদনগরের প্রশাসনিক ইতিহাসে এই ১ বছর ৪ মাস কেবল একটি সময়কাল নয় বরং একটি ব্যতিক্রমধর্মী অধ্যায় যেখানে প্রমাণিত হয়েছে, একজন কর্মকর্তা চাইলে নিয়মের ভেতর থেকেও মানবিকতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ সম্ভব।





